কৃষিবিদ মো মানসুর রহমান: বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর ভঙ্গুর অর্থনীতি ও খাদ্যঘাটতি কাটানোর ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত দল বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি)-র ভূমিকা অত্যন্ত গভীর। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যখন খাদ্যসংকট দেশীয় অর্থনীতিকে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিল, তখন কৃষক ও কৃষি ব্যবস্থাভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকেই রাষ্ট্রপুনর্গঠনের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন জিয়াউর রহমান।
বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি-এর ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে ফিরে দেখা প্রয়োজন, কীভাবে একসময় 'কৃষি ও কৃষককেন্দ্রিক উন্নয়ন ভাবনা' দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপরেখাকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল।
১. সেচ ব্যবস্থা এবং ‘খাল কাটা কর্মসূচি’
কৃষি খাতে জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে আলোচিত ও সফল উদ্যোগ ছিল ‘খাল কাটা কর্মসূচি’। ভূ-গর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে রবি শস্যের উৎপাদন বাড়ানো এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচসুবিধা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে হাজার হাজার মাইল খাল খনন করা হয়। এ কর্মসূচির বিশেষত্ব ছিল স্বতঃস্ফূর্ত জনসম্পৃক্ততা। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে নিজে কোদাল হাতে মাঠে নেমে খাল খনন করেছেন তিনি। ফলে বিপুল পরিমাণ জমি সেচ সুবিধার আওতায় আসে এবং খাদ্য উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
২. ১৯ দফার মাধ্যমে স্বনির্ভর কৃষিনীতি:
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শহীদ জিয়া দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি ও পল্লী উন্নয়নের যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন, তার মূল ভিত্তি ছিল ১৯ দফা কর্মসূচি। এই কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতেই ছিল কৃষি। কৃষি খাতকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন—"কৃষকের মুখে হাসি ফুটলেই বাংলাদেশ হাসবে।"
৩. কৃষিঋণ সহজীকরণ ও ভর্তুকি:
কৃষকদের স্বল্প সুদে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার জন্য চালু করা হয় ‘কৃষি ঋণ কর্মসূচি’। গ্রামীণ মহাজনদের শোষণ থেকে প্রান্তিক কৃষকদের রক্ষায় ব্যাংকগুলোকে সরাসরি মাঠে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেন তিনি। পাশাপাশি সার, বীজ, ডিজেল ও কৃষি সরঞ্জামে পর্যাপ্ত সরকারি ভর্তুকির ব্যবস্থা করা হয়, যা কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখে।
৪. আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি:
ঐতিহ্যবাহী চাষ পদ্ধতির বদলে উচ্চফলনশীল (উফশী) জাতের বীজ, রাসায়নিক সারের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পাওয়ার পাম্প ও গভীর-অগভীর নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের সূচনা করেন জিয়াউর রহমান। আধুনিক চাষাবাদ শেখানোর জন্য মাঠপর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের সক্রিয় করা হয় এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) সহ অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ণে জোর দেওয়া হয়।
৫. সবুজ বিপ্লব ও খামারি সংস্কৃতির বিকাশ:
কৃষির পাশাপাশি গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগি খামার এবং মৎস্য চাষের ক্ষেত্রে পারিবারিক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করা হয়। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দুগ্ধ উৎপাদন ও পোলট্রি শিল্প দানা বাঁধতে শুরু করে। এটি কেবল গ্রামীণ বেকারত্ব কমায়নি, দেশের পুষ্টি চাহিদাও মেটাতে ভূমিকা রেখেছে।
আজকের দিনে বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন ও কৃষিতে যে আধুনিক ধারা দেখা যায়, তার একটি বড় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব ও বিএনপির শুরুর দিনগুলোতে। বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এই ঐতিহ্য স্মরণ করার পাশাপাশি বর্তমানের জলবায়ু পরিবর্তন ও আধুনিক প্রযুক্তির সাথে সংগতি রেখে একটি উদ্ভাবনী ও টেকসই কৃষিনীতি নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই হতে পারে শহীদ জিয়ার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
লেখক: যুগ্ম-আহবায়ক, বাকৃবি ছাত্রদল ও সাবেক সদস্য এ্যাব।
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com