মুসলিম সালতানাত দখল করে ভারতে বৃটিশ শাসণের শুরু হয়েছিল। ফলে শুরু থেকে মুসলিমরা ই বৃটিশ বিরোধী ছিল। পলাশির প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দোলার পরাজয়ের পর প্রথম বারের মত মুসলমানদের নেতৃত্বে ই বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল যা ইতিহাসে ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ নামে পরিচিত। এটি ছিল বৃটিশদের বিরুদ্ধে উপমহাদেশের প্রথম দীর্ঘমেয়াদী সশস্ত্র সংগ্রাম। মুসলমানদের এই মৃত্যুঞ্জয়ী সংগ্রামে সহসা অবলীলায় যে ধ্বনী উচ্চারিত হত তা হল “নারায়ে তাকবীর”।
বৃটিশরা নিজেদের শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে মনে করত। ব্রিটেনের সমাজ ব্যবস্থায় সামাজিক মর্যাদার পাঁচটি ধাপ ছিল, যথা ডিউক, মার্কুইস, আর্ল, ভিসকাউন্ট এবং ব্যারন। এদের সবাই ব্রিটেনের সমাজের উচ্চ বংশীয় বা অভিজাত পরিবার। ভারতে যাদের গভর্নর করে পাঠানো তারা মুলত এই সকল গোত্রের ছিল। ফলে তাদের নামের আগে “লর্ড” শব্দটি ব্যাবহার করা হতো। নামের আগে “লর্ড” বা “প্রভু” উপাধি দেয়ার কারণ হল বৃটিশরা মুলত ভারতীয়দের বুঝাতে চাইত যে তারা শুধু শাসক ই নয়, প্রকৃতিগত ভাবে ই তারা শ্রেষ্ট।
তাদের এই শ্রেষ্ঠত্বের বিরুদ্ধে যখন একদল মানুষ বিদ্রোহ ঘোষনা করত আর বিদ্রোহী কণ্ঠে “নায়ারে তাকবীর, আল্লাহু আকবার” স্লোগান তুলত তখন তাদের আভিজাত্যের সম্ভ্রম তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ত। বিদ্রোহীরা যখন সমস্বরে আকাশ বাতাস উদ্বেলিত করে আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষনা করত তখন শুধু বৃটিশদের মিথ্যে আভিজাত্যে আঘাত লাগত না বরং তাদের মনস্তত্ত্বে বিশাল পীড়ার সৃষ্টি করত।
তৎকালীন বৃটিশ গভর্নরদের ডায়েরী, বৃটিশ শাসণের শেষের দিকের পত্রিকা গুলোতে এমন বর্ননা পাওয়া যায়। বৃটিশ ঐতিহাসিক ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার এর “The Indian Musalmans” গ্রন্থে এমন বর্ননা পাওয়া যায়। হান্টার এর ভাষায় মুসলমানদের আন্দোলন শুধু কেবল বিদ্রোহ ছিল না বরং গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস, আবেগ ও স্বাধীনতাবোধের সংমিশ্রণ ছিল। যা নারায়ে তাকবীর স্লোগানের মাধ্যমে প্রকাশিত হত।
হান্টারের বর্ননায় আরো আছে ” মুসলমানরা কেবল তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে বৃটিশ শাসকদের অস্বীকার করে “দারুল হারব” বা “শত্রু কবলিত দেশ” ঘোষনা করে জিহাদের ডাক দিত।
বৃটিশদের ডায়েরী এবং তৎকালীন পত্রিকায় “নারায়ে তাকবীর” স্লোগানকে নানা ভূষণে ভুষিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তারা নানা সময়ে এই স্লোগানকে Incediary Slogan, Roar of the fanatics, war -cry, Religious Frenzy সহ নানা নামে উপস্থাপন করেছে।
ক্যাপ্টেন হাডসন সহ অনেক বৃটিশ অফিসারের ডায়েরীতে পাওয়া বর্ননাতে বলা আছে ” যখন সেনানিবাসের বাইরে হাজার হাজার মানুষ সমস্বরে “নারায়ে তাকবির” স্লোগান দিত তখন তাদের মনে ত্রাসের সৃষ্টি হত। একে তারা ফ্যানিটিকের স্লোগান হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তিতুমীরের বাশেরকেল্লায় অভিযানের ব্যাপারে বৃটিশ ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডার যখন রিপোর্ট করেন তখন তিনি একটি স্লোগানকে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আরো বলেন “তিতুমীরের অনুসারীরা কোন সামরিক প্রশিক্ষণ ছাড়া কেবল স্লোগানের শক্তিতে প্রশিক্ষিত সুশৃঙ্খল বৃটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যেত। এটি বৃটিশদের বিরুদ্ধে এক অবোধ্য ও বিপদজনক শক্তি।”
নীল বিদ্রোহের সময় নীলকর সাহেবরা লর্ড ক্যানিং এর নিকট যে চিঠি লিখে তাতে উল্লেখ করেন ” এই প্রজারা এখন আর আমাদের ভয় পায় না, যখন তারা তাদের উপাস্যের নাম নিয়ে চিৎকার করে তখন তারা আইন অমান্য করতে দ্বিধাবোধ করে না।”
বৃটিশরা পর্যবেক্ষণ করেছিল এই স্লোগান দিলে ভয়ার্ত ভারতীয়রা ভয়ডরহীন হয়ে ওঠে। বৃটিশদের আনুগত্যের বাইরে গিয়ে সবাই যেন এক ঐশীশক্তির বলে ঐক্যবদ্ধ হয় ওঠে। বুলেট, বোমা আর বেয়নেটের সামনে জীবন দেয়ার এক অনবদ্ধ শক্তি খুজে পায়।
মুক্তিযুদ্ধে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের বহুল ব্যাবহৃত স্লোগান ছিল “জয় বাংলা”। তবে এর পাশাপাশি অঞ্চল ভিত্তিক মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ইউনিটে ” নারায়ে তাকবির” স্লোগানের প্রচলন ছিল বলে বিভিন্ন বর্ননায় পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্থানী বাহিনী বাহিনী ও তাদের দোসরেরা ধর্ম যুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে এলাকায় এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের “নারায়ে তাকবির” স্লোগান, প্রমাণ করেছিল ইসলাম কেবল পাকিস্থানীদের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। “নারায়ে তাকবির” শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে রণধ্বনী। এই স্লোগান বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের কাছে মুক্তি সংগ্রামকে আরো আবেগী, আরো বিশ্বাসী করে তোলো।
দীর্ঘদিনের আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির ভয়াল থাবায় “নারায়ে তাকবীর” একেবারে নিষিদ্ধ স্লোগানে পরিনত হয়েছিল। আধিপত্যবাদী স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছাত্রজনতা চব্বিশের জুলায়ে আজাদির যে নতুন সংগ্রামের সূচনা করে সেই সংগ্রামে ও জীবনীশক্তি সঞ্চারে আবারো আকাশ বাতাস মুখোরিত করে ধ্বনিত হয় “নারায়ে তাকবীর,আল্লাহু আকবার”। সুদূর ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে কাশ্মীর কীংবা কাদামাটির বাংলাদেশ, আবু উবায়দা থেকে শুরু করে ওসমান হাদী, বিপ্লবীদের মুখে এক অভিন্ন স্লোগান ” নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার”।
আসিফ ইকবাল, শিক্ষার্থী, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।


