জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে যেমন আনন্দ, তেমনি আছে আত্মসমালোচনা ও নতুনভাবে শুরু করার অনুপ্রেরণা। জন্মদিনও তেমনই এক দিন, যা শুধু উৎসব বা আনন্দের নয়। এটি আত্মদর্শনের, আত্মসমালোচনার এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি বিশেষ উপলক্ষ। আজ ১০ নভেম্বর, আমার প্রিয় সন্তান তাসিন হোসেন লাবিদের জন্মদিন। ২০১৪ সালের এই দিনে দক্ষিণ কোরিয়ায় তার জন্ম। আজ আমি ওর কাছে না থাকলেও দোয়ার প্রার্থনায় যেন মনে হয়, তাসিন আমার কাছেই আছে। মহান আল্লাহ পাক তাসিনের জিম্মাদার হয়ে যান, এই দোয়াই করছি।
জন্মদিন শুরু হয় জন্মের দিন থেকে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এটি শুরু হয় আরও আগে, রুহানি জগতে, পিতার ঔরস্যে, মায়ের গর্ভে এবং আবার শুরু হবে পরকালের জগতে। তাই জন্মদিন কেবল একটি তারিখ নয়, এটি পুরো জীবন জগতের এক ধারাবাহিক যাত্রা, এক প্রারম্ভিকতা। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন— “যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য, কে তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম” (সূরা আল মুলক: ২)।
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জীবনের আসল উদ্দেশ্য হলো উত্তম আমল ও নৈতিকতা অর্জন করা।
প্রতিটি জন্মদিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কবর অতি সন্নিকটে। জ্ঞানীরা তাই প্রশ্ন তোলেন, আমলের খবর কী? এই দিনটি আমাদের শেখায়, আমরা কোথায় ছিলাম, কী করেছি এবং কীভাবে আরও ভালো মানুষ হতে পারি। জন্মদিনে আমরা পাই মায়ের চোখের আশীর্বাদ, বাবার মিষ্টি হাসি, বন্ধুদের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আত্মজিজ্ঞাসার আহ্বান, আমরা কি সঠিক পথে আছি?
অনেকে জন্মদিনে কেক কাটে, কেউ ফুলে সাজায়, কেউ নীরবে আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। আসলে জন্মদিন হলো কৃতজ্ঞতার দিন, আল্লাহর দেওয়া জীবনের প্রতি এক নরম ধন্যবাদ, যেখানে প্রার্থনা, ভালোবাসা ও আশা মিলেমিশে এক সুন্দর সুর তোলে। জীবনের প্রকৃত সার্থকতা তখনই আসে, যখন আমাদের প্রতিটি কাজ, চিন্তা ও আচরণ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়।
জন্মদিন পালনের ইতিহাসও বেশ প্রাচীন। প্রায় ৩০০০ বছর আগে প্রাচীন মিশরে প্রথম জন্মদিন পালনের প্রথা দেখা যায়। তখন এটি ছিল ফারাওদের রাজ্যাভিষেকের দিন, যেদিন রাজাকে দেবতাস্বরূপ ঘোষণা করা হতো—সেই দিনকেই ধরা হতো তাঁর “দেবজন্ম”। পরবর্তীতে এটি গ্রিস ও রোমে জনপ্রিয় হয় এবং ১৮শ শতকে জার্মানিতে কেক ও মোমবাতি দিয়ে আধুনিক জন্মদিন পালনের প্রথা শুরু হয়। তবে ইসলাম ধর্মে জন্মদিন পালন করা বৈধ নয়, এমন ফতোয়া দিয়েছে উপমহাদেশের বিখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপিঠ দারুল উলূম দেওবন্দ।
তবুও আমরা চাই জন্মদিন হোক উত্তম নীতিচর্চা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও পরোপকারিতার স্মারক দিন। যেন এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত আছে আমলে, ন্যায়ে ও মানবিকতায়। আসুন, আমরা উত্তম নীতিচর্চার মাধ্যমে জীবনচর্চা করি, সৎ কর্মে নিজেদের গড়ে তুলি, এবং জীবনের প্রতিটি অধ্যায়কে অর্থবহ করে তুলি। তবেই জন্মদিন হবে সত্যিকার অর্থে সার্থক, ইনশাল্লাহ।
লেখক: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, নরসিংদী।


