কৃষিবিদ ডা শাহাদাত হোসেন পারভেজ: কিছু মানুষের জীবন সংক্ষিপ্ত হলেও তাঁদের কর্ম দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যায়। আরাফাত রহমান কোকো ছিলেন তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব। মাত্র ৪৫ বছরের জীবনে, দেশের সবচেয়ে সুপরিচিত রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হয়েও তিনি সরাসরি রাজনীতির পরিবর্তে ক্রীড়া ও ক্রীড়া প্রশাসনের ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। তাঁর কাজের ধরণ ছিল নীরব, কিন্তু প্রভাব ছিল গভীর ও সুদূরপ্রসারী।
জন্ম, পরিবার ও শৈশব: ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট চট্টগ্রামে তাঁর জন্ম। ডাকনাম ছিল ‘কোকো’। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছোট ভাই।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন শান্ত, সংযত এবং তুলনামূলকভাবে অন্তর্মুখী স্বভাবের। পারিবারিকভাবে রাজনৈতিক পরিবেশে বড় হলেও তাঁর আগ্রহ ছিল ভিন্ন দিকে-বিশেষ করে খেলাধুলা, প্রযুক্তি এবং সংগঠন ব্যবস্থাপনার প্রতি। স্কুলজীবন থেকেই তিনি দলগত কাজ ও ক্রীড়া কার্যক্রমে অংশ নিতে পছন্দ করতেন।
বাবাকে হারানো ও পারিবারিক প্রভাব: ১৯৮১ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হন। এই ঘটনা তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। এরপর তিনি মায়ের সান্নিধ্য ও বড় ভাই তারেক রহমানের তত্ত্বাবধানে বড় হন। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পারিবারিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তাঁদের পারিবারিক বন্ধন ছিল অত্যন্ত দৃঢ়।
এই সময় থেকেই কোকোর মধ্যে দায়িত্ববোধ, সংযম এবং বাস্তববাদী চিন্তার বিকাশ ঘটে। তিনি ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেন যে সরাসরি রাজনীতির বাইরে থেকেও দেশের জন্য কাজ করা সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্মৃতিতে কোকো: তারেক রহমানের কাছে কোকো ছিলেন কেবল ছোট ভাই নন, বরং একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও নির্ভরতার প্রতীক। তাঁদের সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং বোঝাপড়ায় ভরপুর।
তারেক রহমানের স্মৃতিতে কোকো ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি কম কথা বললেও গভীরভাবে ভাবতেন। পারিবারিক দায়িত্ব, ব্যক্তিগত জীবন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় দুই ভাইয়ের মধ্যে ছিল এক ধরনের নীরব সমন্বয়। ভিন্ন পথে চললেও তাঁদের সম্পর্ক ছিল অটুট ও আন্তরিক।
ক্রিকেটে অবদান: ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের গেমস ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়কালকে বাংলাদেশের ক্রিকেট উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তিনি বিশ্বাস করতেন, ক্রিকেটকে শুধু জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে তৃণমূল পর্যায় থেকে গড়ে তুলতে হবে। তাঁর উদ্যোগে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ক্রিকেট কাঠামোকে শক্ত ভিত্তি দেয়।
হাই পারফরম্যান্স ইউনিট: প্রতিভাবান তরুণ ক্রিকেটার গড়ে তোলার লক্ষ্যে হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) ইউনিট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এই ইউনিটের মাধ্যমে তরুণ খেলোয়াড়দের আধুনিক প্রশিক্ষণ, ফিটনেস উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রস্তুতির সুযোগ তৈরি হয়।
পরবর্তীতে এই কাঠামো থেকে বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রিকেটার উঠে আসে, যারা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
মিরপুর স্টেডিয়াম উন্নয়ন: মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার প্রক্রিয়া তাঁর সময়েই শুরু হয়। অবকাঠামো উন্নয়ন, মাঠের মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের উপযোগী করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এই স্টেডিয়াম পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যুতে পরিণত হয়, যা দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে একটি মাইলফলক।
দেশজুড়ে ভেন্যু উন্নয়ন: বগুড়া, খুলনা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্রিকেট ভেন্যু উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ফলে ক্রিকেট শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক না থেকে সারাদেশে বিস্তৃত হতে শুরু করে।
এই উদ্যোগ তরুণদের মধ্যে ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং নতুন প্রতিভা আবিষ্কারের পথ খুলে দেয়।
পেশাদার ক্রিকেট কাঠামো: ক্রিকেটারদের কেন্দ্রীয় চুক্তি, ম্যাচ ফি বৃদ্ধি এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রবর্তনের মতো উদ্যোগ তাঁর সময়ের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই পরিবর্তনগুলো খেলোয়াড়দের আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাদার মনোভাব গড়ে তুলতে সহায়তা করে, যা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আরও সংগঠিত ও আধুনিক করে তোলে।
ব্যক্তিজীবন: তিনি শর্মিলা রহমান সিথিকে বিবাহ করেন। তাঁদের দুই কন্যাসন্তান রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবন তিনি সর্বদা জনসমক্ষে সীমিত ও গোপন রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।
পরিবারের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধ ছিল গভীর। তিনি ব্যক্তিগত জীবনকে আলোচনার বাইরে রেখে কাজের মাধ্যমেই নিজের পরিচয় গড়ে তুলতে চেয়েছেন।
পরবর্তী জীবন ও মৃত্যু: ২০০৭ সালের পর তিনি আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতার মুখোমুখি হন এবং পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করেন। প্রবাস জীবনে তিনি তুলনামূলকভাবে নীরব জীবনযাপন করেন।
২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ক্রীড়া অঙ্গনে একটি আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে।
ইতিহাসের দৃষ্টিতে: বাংলাদেশের ক্রিকেটের অবকাঠামো উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। হাই পারফরম্যান্স ইউনিট, ভেন্যু উন্নয়ন এবং পেশাদার কাঠামোর ভিত্তি নির্মাণে তাঁর সময়কাল গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, তাঁর নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক হতে সহায়তা করেছে।
শেষ কথা: আরাফাত রহমান কোকো ছিলেন একজন নীরব সংগঠক, যিনি আলোচনায় না থেকে কাজের মাধ্যমে অবদান রাখতে চেয়েছেন। তাঁর পরিচয় কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেও তিনি স্মরণীয়।
তাঁর জীবন প্রমাণ করে-সবাইকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হয় না; কেউ কেউ নীরবে ভিত্তি গড়ে দেন, যার ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ এগিয়ে যায়।
লেখক : কৃষিবিদ ও সদস্য, আরাফাত রহমান কোকো ক্রীড়া সংসদ কেন্দ্রীয় কমিটি
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com