ড. মোঃ মাহমূদুল হাসান শিকদার: বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুধু বইয়ের পড়া বা পরীক্ষায় ভালো ফলাফল নয়, বরং জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শেখার সময়ও বটে। ক্যাম্পাসের চার বছর শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের নয়, বরং নিজেকে গড়ে তোলার এক অনন্য সময়। শুধু ভালো সিজিপিএ থাকলেই সফল ক্যারিয়ারের নিশ্চয়তা মেলে না—এই সময়ে প্রয়োজন নানা জীবনদায়ী স্কিল, যেগুলো একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া মানেই এক নতুন জীবনের শুরু। এখানে টিকে থাকতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সময় ব্যবস্থাপনা শেখা। ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা, ক্লাব কার্যক্রম কিংবা পার্ট টাইম চাকরি—সব কিছুর ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে অল্পতেই হতাশা গ্রাস করতে পারে।
একাই থাকা শেখা আজকের সময়ে জরুরি স্কিল। বিশেষ করে হোস্টেল বা মেসে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য এটি আবশ্যক। মেন্টাল হেলথ বা মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা রাখা, নিজের খেয়াল নিজে রাখা আর রান্না, কাপড়-বাসন ধোয়ার মতো দৈনন্দিন কাজগুলো শিখে নেওয়া স্বাধীনতা অর্জনের মূলধাপ।
অর্থনৈতিকভাবে সচেতন হওয়া জরুরি। মাসের শুরুতেই পরিকল্পনা ছাড়া খরচ করলে মাসের শেষটা অনাহারে কাটার অবস্থা তৈরি হতে পারে। তাই ব্যক্তিগত বাজেট ম্যানেজমেন্ট একটি অপরিহার্য দক্ষতা।
একাডেমিক কাজগুলো সহজ করতে প্রয়োজন Microsoft Excel ও Google Docs ব্যবহারে দক্ষতা। এর পাশাপাশি ইমেইল লেখার নিয়ম জানা, প্রেজেন্টেশন ও পাবলিক স্পিকিং স্কিল, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ “না” বলার সাহস – এসবই একজন শিক্ষার্থীকে করে তোলে আত্মনির্ভর।
শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা রক্ষা করতে হলে নিয়মিত ঘুম ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। গসিপ থেকে নিজেকে দূরে রাখা, সিনিয়রদের সম্মান করা, জুনিয়রদের সহযোগিতা করা, এবং টিমওয়ার্কে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া—এগুলো শুধু ক্যাম্পাস নয়, বরং পেশাগত জীবনেও বড় সম্পদ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হবে। এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিতে যুক্ত থাকা যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি অনলাইন রিসোর্স থেকে শেখা শেখার পরিধি বাড়ায়।
শুধু পাস করাই নয়, বরং CV হালনাগাদ রাখা, মেন্টাল হেলথ বিষয়ে সচেতনতা, রিসার্চ পেপার পড়ার অভ্যাস, টিম কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্ট, এবং LinkedIn প্রোফাইল তৈরি—এই স্কিলগুলোই ভবিষ্যতের সফলতা গড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাসে প্রশ্ন করতে লজ্জা পাওয়া, নিজেকে উপস্থাপন করতে না পারা—এসব এখন অতীত। একজন সফল শিক্ষার্থীকে হতে হবে আত্মবিশ্বাসী, ইতিবাচক এবং অভিজ্ঞদের সঙ্গে সংযোগ গড়ায় আগ্রহী।
সবশেষে, সফল ক্যাম্পাস জীবনের জন্য নেতিবাচক প্রভাব এড়িয়ে চলা এবং সফলদের সান্নিধ্যে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন হলো জীবনের প্রস্তুতিমঞ্চ। এখানে শেখা প্রতিটি স্কিলই ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়। তাই শুধু সার্টিফিকেট নয়, গড়ে তুলুন বাস্তব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাও। তাহলেই হবে পরিপূর্ণ একজন সফল মানুষ হয়ে ওঠা।
লেখক: প্রফেসর, ফার্মাকোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
সংবাদ লাইভ/মতামত


