ঢাকাই সিনেমার ক্ষণজন্মা নায়ক সালমান শাহ। সিনেমা ক্যারিয়ার তার খুব বেশি দিনের নয়। মাত্র তিন বছরের। ১৯৯৩ সালে অভিষেক। আর সেটা শেষ হয় ১৯৯৬ সালে। ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নেন তিনি। রাজধানীর ইস্কাটনের বাসা থেকে সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আত্মহত্যা করেছিলেন তিনি। ওই সময় প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা করেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই অভিযোগটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করা হয়। এ বিষয়ে তদন্ত করতে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত। তদন্ত শেষে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। প্রতিবেদনে এ ঘটনাকে আত্মহত্যা বলা হয়। পরে ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন গৃহীত হয়। তবে প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করেন কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচারবিভাগীয় তদন্তে পাঠান আদালত। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট আদালতে বিচারবিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। ওই প্রতিবেদনেও সালমান শাহর মৃত্যুকে অপমৃত্যু বলা হয়। কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরীর মৃত্যুর পর ছেলে হত্যা মামলার বাদী হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হন মা নীলা চৌধুরী। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে বিচারবিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজির আবেদন করেন। সর্বশেষ মামলাটি পিবিআই তদন্ত করে। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর আদালত ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলাটি নিষ্পত্তি করেন। ২০২২ সালের ১২ জুন এ আদেশের বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন মামলা দায়ের হয়।
অভিনেতার মা কোনোভাবেই তার ছেলে আত্মহত্যা করেছে, এটা মানতে নারাজ। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন সালমান শাহ হত্যার বিচার হবে, আমি এটার বিচার করব। কিন্তু তিনি করলেন কোথায়? আমি জানতাম শেখ হাসিনার আমলে বিচার হবে না। আমরা শেখ হাসিনা সরকারের পরিবর্তন চেয়েছিলাম। নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে ওই সরকারের বিদায় দরকার ছিল। অবশেষে তাদের বিদায় হয়েছে। আমরা নতুন সরকারের কাছে সালমান শাহ হত্যার বিচার চাই।’
অভিযোগ করে নীলা চৌধুরী বলেন, ‘বনজ কুমার (হাসিনার আমলে পিবিআইয়ের প্রধান) অনেক টাকা খেয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন। আমাদের কাছে বারবার টাকা চাওয়া হয়েছে। সালমান শাহর অডিও রেকর্ডের ক্যাসেট পিবিআইয়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু তা ফেরত পাইনি। এ মামলার বিচার চাইতে গিয়ে অনেক হেনস্তার শিকার হয়েছি।’
এদিকে সালমানের মৃত্যুর জন্য তার ভক্তদের মধ্যে অনেকে তার স্ত্রী সামিরা এবং কেউ কেউ চিত্রনায়িকা শাবনূরকে দায়ী করেন। সালমানের মায়ের অভিযোগের তীরও প্রয়াত ছেলের স্ত্রীর দিকে। তবে এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছেন শাবনূর ও সামিরা।
সালমান শাহকে দাফন করা হয়েছে সিলেটের শাহজালাল (রহ)-এর মাজারের কবরস্থানে। তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল সিলেট শহরের দাড়িয়াপাড়ার নানার বাসায়। তাই মৃত্যুর পরও চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে আছেন প্রিয় শহরেই। আর মৃত্যুবার্ষিকী এলেই নানার বাসার সামনেই ভক্তরা তাদের প্রিয় নায়ককে স্মরণ করতে, প্রিয় নায়কের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি ছুঁয়ে দেখতে ভিড় জমান। দূরদূরান্ত থেকে আসেন তারা। সালমানের কবর জিয়ারত করেন, তার শৈশব কৈশোরের স্মৃতির সঙ্গে ভক্তরাও যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকতে চান। হয়তো কারও চোখে তখন দুফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ে।
সালমান শাহর জন্ম ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায়। সালমানের দাদার বাড়ি সিলেট শহরের শেখঘাটে আর নানার বাড়ি দারিয়াপাড়ায়। নানার বাড়ির নাম এখন ‘সালমান শাহ হাউস’। স্কুলে পড়ার সময় সালমান বন্ধু মহলে সংগীতশিল্পী হিসাবে বেশ পরিচিত ছিলেন। ছায়ানট থেকে পল্লীগীতিতে দীক্ষা নেন। সিনেমায় আসার আগেই ১৯৯২ সালের ১২ আগস্ট বিয়ে করেন তিনি। স্ত্রী ছিলেন সামিরা হক। ধারাবাহিক ‘পাথর সময়’ সময় নামে নাটক দিয়ে অভিনয় ক্যারিয়ার শুরু করেন এ নায়ক। পরে আরও কিছু নাটকে অভিনয় করেন। এরপর ১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে শুরু হয় তার বড় পর্দায় পথচলা। প্রথম সিনেমায়ই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পান। নায়িকা ছিলেন মৌসুমী। পরে এ অভিনেত্রীর সঙ্গে আরও ‘স্নেহ’ এবং ‘অন্তরে অন্তরে’ নামে দুটি সিনেমায় অভিনয় করলেও আর কখনো এক সিনেমায় তাদের দেখা যায়নি। এরপর আরেক জনপ্রিয় নায়িকা শাবনূরের সঙ্গেই জুটি গড়ে তোলেন তিনি। সালমান শাহর সঙ্গে জুটি হয়ে আরও অভিনয় করেন শাবনাজ, শাহনাজ, লিমা, শিল্পী, শ্যামা, সোনিয়া, বৃষ্টি, সাবরিনা ও কাঞ্চি।
ক্ষণজন্মা এ নায়ক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ২৭টি সিনেমায় অভিনয় করেন।
তার সঙ্গে চিত্রনায়িকা শাবনূরের জুটি ছিল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে তাদের সবচেয়ে সেরা জুটিও বলেন অনেকে। একসঙ্গে ১৪টি সিনেমা করেছিলেন তারা। প্রতিটিই হিট ছিল। তাদের পর্দার রসায়ন ছিল নজরকাড়া। এ জুটির বাস্তব জীবনের রসায়ন নিয়েও তুমুল চর্চা হতো। সালমান-শাবনূরের তখনকার সম্পর্ক নিয়ে এখনো চর্চা হয়। ক্ষণজন্মা এ নায়ককে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে শাবনূর বলেন, ‘সালমান শাহ এমন একটি নাম, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সোনালি সময়। অতি অল্প সময়ে অগণিত ভক্তের মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে গেছেন। কিন্তু স্বপ্নেও ভাবিনি এত তাড়াতাড়ি পাড়ি দেবে না ফেরার দেশে। সালমানের এই চলে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কারণ, তার আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল। প্রতি বছর এদিন কোটি ভক্তের হৃদয় আলোড়িত করে সালমান শাহ ফিরে আসেন ক্ষণিকের জন্য। অকাতর ভালোবাসা অঞ্জলি নিয়ে ফিরে যান অযুত নক্ষত্রের ভিড়ে। যেখানেই আছ, ভালো থেকো সালমান শাহ।’
সালমানের সঙ্গে যারা অভিনয় করেছেন তাদের সবার কাছেই প্রিয় ছিলেন এ নায়ক। তেমনই একজন কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা। স্মৃতিচারণ করে ববিতা বলেন, ‘সত্যি বলতে কী সালমান শাহ অনেক বেশি ভালো অভিনেতা ছিল। পোশাকে ফ্যাশনে নতুনত্ব তো সৃষ্টি করেছিলই, তা সবাই দেখেছেন এবং তার ফ্যাশন এখনো অনেকেই ফলো করেন। এটা অনেক বড় বিষয়। আর অভিনেতা হিসাবে সালমান নিজেই ছিল অনন্য। এমনভাবে সংলাপ বলত, এমনভাবে এক্সপ্রেশন দিত, এটা বোঝার উপায় থাকত না যে, অভিনয় নাকি সত্যি। পরিচালকের কাছ থেকে দৃশ্য বুঝে নিয়ে এমনভাবে সংলাপ বলত যে, তার সহশিল্পীর জন্যই সেই অভিনয়ের কাউন্টার দেওয়া কঠিন হয়ে যেত। সালমান সত্যিই অনেক বড় মাপের অভিনেতা ছিল। তার মতো অভিনেতার অকাল প্রয়াণ সত্যিই আমাদের জন্য অনেক বেদনার, অনেক কষ্টের। এ কষ্টটা আমাদের বয়ে বেড়াতে হবে আরও দীর্ঘদিন। তার মৃত্যুটাও একটা রহস্য হয়ে থেকে গেল! দোয়া করি আল্লাহ যেন তার আত্মার শান্তি দেন, তাকে বেহেশত নসিব করেন।’
নিউজের জন্য: news.sangbadlive24@gmail.com